Wednesday, October 28, 2015

মালেশিয়া ভ্রমন - ৬: লাংকাবিতে ঘোরাঘুরি, কেবল কার আর সীফুড ডীনার ( চতুর্থ দিন )

গতরাতে লাংকাবীতে পৌছে অনেক রাত পর্যন্ত সাগরপাড় আর রাস্তাঘাটে ঘোরাঘুরি করা হয়েছে। এজন্যে ঘুমাতে দেরী হয়েছে, তাই আজকে ঘুম থেকে উঠতেও দেরী হয়ে গেলো। হাতমুখ ধুয়ে সবাই মিলে নাস্তা খেতে বেরুলাম। আমি ছাড়া সবাইই অনেকদিন বর্নিও তে থাকে, তারা অনেকদিন পর কুয়ালালামপুরে এসে দেশী খাবার খেতে পেয়ে মজা পেয়ে গেছে, তাই ওরা এখানেও বাংলাদেশী কিংবা ভারতীয় খাবারের সন্ধানই করতে চাইলো। অনেক খুজে একটা ভারতীয় রেস্টুরেন্ট পেলাম, তার সার্ভিং বন্ধ হয়ে গেছে। পরে মালেশিয়ান ট্রেডিশনাল একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে ডাল-পরাটা টাইপের কি যেন খেলাম, খুব বেশি সুবিধে লাগলো না।

লাংকাবির একটি থাই রেস্টুরেন্ট, রাস্তার পাশে এরকম অসংখ্য রেস্টুরেন্ট রয়েছে

আগের দিনের ভাড়া করা গাড়িটা আছে, শাহিদ সেটায় করে নিয়ে পুরো লাংকাবি চক্কর দেয়ালো আমাদেরকে। দ্বীপের এ মাথা থেকে ওমাথা পুরোটা কয়েকবার দেখে ফেললাম, চমতকার ও আধুনিক একটা দ্বীপ। পুরো দ্বীপে অনেক রিসোর্ট রয়েছে এবং সেগুলোকে এমনভাবে জায়গা দেয়া হয়েছে যে এখানকার সাধারন মানুষদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যাতে খুব একটা প্রভাবিত না হয়। ন্যাটিভদের আবাসিক এলাকাগুলোতে এখনো দ্বীপসূলভ গ্রাম গ্রাম একটা ভাব রয়েছে।

শাহিদ ভাই আমাদেরকে চমতকার একটা জেটিতে নিয়ে গেলো। প্রাইভেট বোটে করে যারা মালেশিয়ায় আসতে চান তারা এখানে ল্যান্ড করতে পারেন। বোটে আসা শখের নাবিক পর্যটকদের জন্যে এখানে ইমিগ্রেশন অফিসও রয়েছে।

নাবিক পর্যটক ও ফিশিং বোটের জেটি

বোটে আসা পর্যটকদের জন্যে ইমিগ্রেশন অফিস
জেটি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে চড়ে এবার চলে এলাম একটা কুমিরের খামারে। জায়গাটা খুবই সুন্দর পুরো এলাাকাটা একটা বাগানের মতন। ভেতরে অনেকগুলো ছোট, বড় জলজ খাঁচায় বিভিন্ন সাইজের কুমির পালা হয়। ভয়ংকর সুন্দর একটা জায়গা‍‍‍।

কুমির খামারের প্রধান ফটক

বাচ্চা কুমিরের গন-খাচা

একটা পুকুরে ভেসে থাকা কুমির
কুমিরের খামার থেকে বেরিয়ে খামার এলাকার ভেতরেই দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়া হলো। এর পরের গন্তব্য কেবল কার। এখানকার কেবল কারটা গেন্টিং এর টার চাইতেও বেশি খাড়া আর ভয়ংকর। একটা পাহাড়ের চুড়ায় গিয়ে থেমেছে যেখানে হিন্দি মুভি "ডন" এর শুটিং হয়েছিলো।

লাংকাবি কেবল কার

কেবল কারের উপরের স্টেষন থেকে ভিউ
কেবল কারের ল্যান্ডিং স্টেষনের ভেতরে একটা থ্রিডি মুভি হল আছে। সেখানে ভয়ংকর একটা রোলার কোস্টার এক্সপেরিয়েন্স এর মুভি দেখানো হয়, কিন্তু মুভিটা খুব বেশি ভালো লাগেনি, অযথা এর জন্যে টিকেট কাটার কোন মানে হয় না। সাথে থাকা একশন ক্যাম দিয়ে কেবল কারের এক্সপেরিয়েন্সটা ক্যাপচার করতে চেয়ে্ছিলেম, নিচের ভিডিওতে চাইলে দেখে নিতে পারেন:


এরপর আর তেমন বিশেষ কোন ঘোরাঘুরি নেই। কিছুক্ষন সৈকতে সময় কাটিয়ে দিনের আলোটা নিভে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হলো। এই সুযোগে কেউ কেউ আবার সাগরে গা ভিজিয়ে নেয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করলোনা। এখানকার সীবিচ কক্সবাজারের মত উত্তাল না, অনেকটা নোনতা পানির নদীর মতই এর আচরন। আশপাশে অনেকগুলো দ্বীপ নিয়ে লাংকাবি দ্বীপপূঞ্জ, এজন্যে মূল দ্বীপটা পর্যন্ত ঢেউ এসে পৌছাতে পারেনা, ছোট দ্বীপগুলোতে ধাক্কা খেয়ে ঢেউগুলো মরে যায়।
লাংকাবি'র সমুদ্র সৈকত
হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হলাম, তারপর কিছুক্ষন জিরিয়ে নিলাম, কম্পিউটারে টুকটাক কাজকর্মও সেরে নিলাম। রাতে সী-ফুড দিয়ে ডিনার হবে, ভালো একটা টার্কি রেস্টুরেন্ট দেখেছিলাম, সেখানেই হয়তো যাওয়া হবে।


লাংকাবি'র পর্যটন পাড়া "পান্তাই চেনাং" এর রাস্তাঘাট
প্রথমেই বেরিয়ে একটা ট্রাভেল কোম্পানির সাথে পরের দিনে "আইল্যান্ড হপিং" অ্যাডভেঞ্চারের জন্যে প্যাকেজ কেনা হলো। প্রত্যেকের জন্যে দশ রিংগিত করে খরচ পড়লো, ওরা সকালে এসে গাড়িতে করে নিয়ে যাবে, দুতিন ঘন্টায় আশপাশের অনেকগুলো দ্বীপে ঘুরিয়ে নিয়ে আবার হোটেলে পৌছে দেবে। চমতকার জিনিস কিন্তু খুবই সস্তায় পাওয়া গেলো।

রাস্তার পাশে সীফুড রেস্টুরেন্টের বাইরে সাজিয়ে রাখা জীবন্ত লবস্টার
 ডিনারের জন্যে হাটতে শুরু করলাম। রাস্তার পাশে অনেক ধরনের রেস্টুরেন্ট আর ক্যাফে রয়েছে। সারাদিন পুরো এলাকা প্রায় নিস্তব্ধ থাকলেও রাতে কেন জানি সবকিছু জেগে উঠেছে। আমাদের লক্ষ্য সীফুড রেস্টুরেন্ট, অনেকগুলো আছে এখানে এবং সব রেস্টুরেন্টের বাইরেই তাদের সার্ভিং মাছের একটা করে শোকেস রাখা আছে।


সী-ফিস শোকেস

লবস্টারের একটা খাবার আইটেম

এইটা কি মাছ মনে নাই
একটা চমতকার রেস্টুরেন্টে চমতকার সব খাওয়া দাওয়া শেষ করে আবার কিছুক্ষন ঘোরাঘুরি, তারপর হোটেলে গিয়ে ঘুম।

Monday, October 5, 2015

মালেশিয়া ভ্রমন-৫: তৃতীয় দিন, লাংকাবির পথে

আগের দিনের ক্লান্তির রেশে ঘুম থেকে উঠতে উঠতে অনেক দেরী হয়ে গেলো। আজকের দিনে তেমন কোন পরিকল্পনা নেই। আশ পাশে খানিকক্ষন ঘুরাঘুরি আর টুকটাক কেনাকাটা শেষে এয়ারপোর্টে চলে যাব, সেখান থেকে দুপুরের পর লাংকাবির ফ্লাইট। এয়ার এশিয়ার প্লেনের টিকেট কাটা হয়েছে।

কুয়ালালামপুরের সাধারন এপার্টমেন্ট ও ট্রান্সপোর্ট


যথারীতি সকালের নাস্তা খাওয়া হলো। ব্যাগগুলো সব আগের দিনের ভাড়া করা সেই গাড়িতে উঠানো হলো। গাড়ির মালিক এয়ারপোর্ট থেকে তার গাড়িটা রিসিভ করে নেবে। শাহিদ ভাই আর ইমরান ভাই ব্যাগসহ গাড়িতে করে এয়ারপোর্টে যাবে, আর আমরা তিনজন হাই-স্পীড ট্রেনে করে যাবো।

লইয়াত নামে একটা মার্কেট থেকে একটা আইপড শাফল কিনলাম, ছোট্ট একটা ডিভাইস, কিন্তু অডিও শোনার জন্যে চমতকার একটা জিনিস। মাত্র আশি ডলার দাম, কিনে ফেললাম। মুনতাসীর ভাই তাঁর ক্যামেরার জন্যে একটা প্রাইম লেন্স কিনলেন।

KLIA Ekspress ট্রেনের প্লাটফরম


আমরা তিনজন কেএল সেন্ট্রালে চলে এলাম। আধঘন্টা বা বিশ মিনিট পর পর এখান থেকে KLIA Ekspress ছেড়ে যায়। টিকেট কেটে প্লাটফরমে কিছুক্ষন অপেক্ষা করতেই ট্রেন চলে এলো। ট্রেনে চেপে বসলাম, জীবনের প্রথম হাইস্পীড ট্রেনে চড়া, প্রায় আশি কিলোমিটার রাস্তা মাত্র বিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যে পাড়ি দিয়ে আমাদেরকে KLIA2 তে নামি দিলো। ট্রেনটা KLIA2 তে থামার আগে KLIA তেও কিছুক্ষনের জন্যে থামে, যারা ঐ এয়ারপোর্টে যেতে চান তারাও এতে করে আসতে পারেন।

KLIA2 Terminal


এদিকে শাহিদ ভাইরাও চলে এসেছেন। এখানে আমরা সবাই মিলে লাঞ্চ করে প্লেনের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রায় দুঘন্টা পরে ফ্লাইট। KLIA2 এর বারান্দা থেকে প্লেন স্পটিং এর খুব ভাল ব্যবস্থা রয়েছে। সময় কাটানোর জন্যে তিনশ মি.মি. লেন্সটা নিয়ে বারান্দায় কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে এলাম।

KLIA2
অজু করে যোহর আর আসরের নামাজ একসাথে পড়ে নিলাম। কিছুক্ষন পর সিকিউরিটি এয়ার এশিয়ার চেকইন আর সিকিউরিটি চেকআপ শেষ করে ওয়েটিং রুমে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আর বিশ পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই ফ্লাইট।

এ প্লেনটায় করে লাংকাবি গিয়েছি
কুয়ালালামপুর থেকে লাংকাবী খুব বেশি সময়ের ফ্লাইট নয়। আকাশ খারাপ থাকাতে আজকে একটু বেশি সময় লেগে গেছে। তাও বড়জোর চল্লিশ-পঞ্চাশ মিনিট। খানিক পশ্চিম থেকে পুবে উড়ে যাওয়াতে বিকেলটা কেমন জানি তাড়াতাড়ি উড়ে চলে গেলো। প্লেন থেকে নেমে দেখি সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
লাংকাবি এয়ারপোর্ট
এয়ারপোর্ট থেকে বের হবার আগে মাগরিবের নামাজ টা পড়ে নিলাম। এখানকার কর্মকর্তারাও খুব ভালো ও বন্ধুবত্সল। নামাজের জায়গার কথা জিজ্ঞেস করতেই একজন মহিলা কর্মী সাথে করে নিয়ে গিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে দিলেন। লাংকাবিতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের কোন ব্যবস্থা নাই। অতএব, এখান থেকে বেরিয়ে হোটেল কিংবা অন্য কোথাও যেতে হলে আপনাকে ট্যাক্সি ক্যাব অথবা রেন্ট এ কারের শরনাপন্ন হতে হবে। ট্যাক্সি ক্যাব অনেক বেশি এক্সপেনসিভ, রেন্ট এ কার তুলনামূলক সস্তা। এয়ারপোর্টে বিভিন্ন রেন্ট এ কারের এজেন্সি আছে, এছাড়াও বাইরে অনেকেই নিজের গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করে ভাড়া দেবার জন্যে। আমরা ওরকম একজনের কাছ থেকে চব্বিশ ঘন্টার জন্যে একটা গাড়ি ভাড়া নিয়েছিলাম।
লাংকাবি এয়ারপোর্টের বাইরের দৃশ্য
লাংকাবিতে আমরা আগে থেকে কোন হোটেল বুক করিনি। গাড়ি নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে তেমন ভাল কোন হোটেল পাচ্ছিলাম না। শেষে একটা পেলাম কিন্তু তারা আমাদেরকে দুদিনের জন্যে ভাড়া দিতে রাজী হচ্ছিলোনা। সেখান থেকে বেরিয়ে মুনতাসীর আর সিয়াম ভাই একটা বুদ্ধি করলেন। ইন্টারনেটে হোটেলটার লিস্টিং খুজে বের করলেন একটা হোটেল বুকিং সার্ভিসের। তারপর সেখান থেকে অনলাইনে দুদিনের জন্যে বুকিং দিয়ে দিলেন। রিসিপ্ট ডাউনলোড হলো, এবার প্রিন্ট করে হোটেলে দেখালেই কেল্লা ফতে। আশপাশে একটা মার্কেট খুজে নিয়ে প্রিন্ট করে নিয়ে আবার ফিরে এলাম। বুকিং কাউন্টারের রিসিপশনিস্ট মেয়েটা আমাদের চালাকি দেখে রাগে গড়গড় করতে থাকলেন, উচ্চস্বরে কথা বলতে লাগলেন। সিয়াম ভাই আর মুনতাসীর ভাই হোটেলের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে এ ব্যাপারে কম্প্লেইন করার হুমকি দিতেই আরেকজন কর্মকর্তা এসে আমাদেরকে খুবই বিনয়ের সাথে রুম দেখিয়ে দিলেন। পরের দুদিনে আর কোন ঝামেলা হয়নি।

Thursday, June 4, 2015

মালেশিয়া ভ্রমন - ৪ : কুয়ালালামপুর (দ্বিতীয় দিন) (Cyberjaya, Putrajaya, Genting Highlands, Batu Caves)

কার রেন্টাল:
রেন্টেড কার

আপনি যদি ড্রাইভিং জানেন আর ধৈর্য ধরে জিপিএস ট্রাকিং মোবাইল এপ এর ইন্সট্রাকশন গুলো ভালভাবে রেসপন্স করতে পারেন তবে কার রেন্টাল থেকে একটা গাড়ি ভাড়া নিয়ে কুয়ালালামপুর ঘুরে বেড়ানোর খরচ এক ধাক্কায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ বানিয়ে নিতে পারেন। কুয়ালালামপুরের ট্যাক্সি ভাড়া পুরোপুরি আকাশছোয়া, আর পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সহজলভ্য মনে হয়নি। সেই হিসেবে মাত্র ১০০ রিঙ্গিতের মধ্যেই আপনি চাইলে একটা গাড়ি ৬/১২ বা ২৪ ঘন্টার জন্যে ভাড়া নিয়ে নিতে পারেন।

কার রেন্টালের জন্যে অনেকগুলো কোম্পানি আছে কুয়ালালামপুরে। তার মধ্যে এয়ার এশিয়া ও মে ফ্লাওয়ার অন্যতম। কুয়ালালামপুরের বিমান বন্দর থেকে এয়ার এশিয়ার গাড়ি ভাড়া করা যায়। আর শহরের মধ্যে গাড়ি ভাড়ার জন্যে মে ফ্লাওয়ার সবচে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এদের অনেকগুলো অফিস আছে, যেকোন টি থেকে আপনি গাড়ি ভাড়া নিতে পারেন। গাড়ি ভাড়া সিদ্ধান্ত নেবার আগে যে ব্যপারটি আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে সেটি হলো গাড়ি যেখান থেকে নিচ্ছেন, তা ঠিক সেখানেই ফেরত দিতে হবে। গন্তব্য থেকে ফিরে আসার সুযোগ না থাকে তবে ট্যাক্সি বা পাবলিক ট্রান্সপোর্টই সবচে ভাল পরিবহন হবে আপনার জন্যে। আর গাড়ি ভাড়া নেবার সময় আপনার যেসব জিনিস জমা দিতে হবে সেগুলো হচ্ছে:
১. পাসপোর্ট,
২. ড্রাইভিং লাইসেন্স
৩. ক্রেডিট কার্ড

এ লিস্টের কোন একটিও যদি আপনার কাছে না থাকে তবে গাড়ি ভাড়া পাওয়া যাবে না। বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনেকেই তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকেন। সোশ্যাল মিডিয়া বা কোন ভাবে তাদের সাথে যোগাযোগ করে আরো অল্প ভাড়ায় ও কম শর্তে গাড়ি ভাড়া নেয়া যেতে পারে।

সাইবারজায়া
একটা ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া নিতে আমরা ট্যাক্সিতে করে সাইবার জায়ায় এসেছিলাম। এ জায়গাটি মূলত কুয়ালালামপুরের প্রধান স্টুডেন্ট জোন। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগই এখানে অবস্থিত। ছাত্রছাত্রীদের জন্যে থাকার জন্যে আবাসিক এলাকাও রয়েছে এখানে। এছাড়াও বড় কিছু কম্পিউটার প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধান কার্যালয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শাখা রয়েছে।

পুত্রাজায়া
হলিউডি কায়দায় পুত্রাজায়া শহরের সাইনবোর্ড

কুয়ালালামপুরের জনবহুলতার কারনে গত দুই দশক ধরে মালেশিয়ান সরকার তাদের রাজধানী পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে তৈরী করেছে পুত্রাজায়া নামক আনকোরা একটি শহর। সাইবারজায়ার খুব কাছাকাছি এই শহরটি অনেকটা বদ্বীপের মত। একদিক থেকে একটি সেতু পার হয়ে শহরে প্রবেশ করতে হয়, শহরটিতে কোন আবাসিক অঞ্চল আছে বলে মনে হয়নি, চারদিকে অনেক উঁচু উঁচু ইমারত থাকলে আশপাশে মানুষের দেখা পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন মন্ত্রনালয় ও সরকারী গুরুত্বপূর্ন অফিসের জন্যে ইমারত গুলো তৈরী করা হয়ে থাকলেও বোধহয় এখনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।



চমতকার একটা লেক দেখতে পেলাম, লেকের চারপাশে কিছু চমতকার স্থাপনাও দেখলাম। লেকের যেপাশে গাড়ি পার্ক করার ব্যবস্থা রয়েছে তার ঠিক উল্টো পাশে আকাশ ছোয়া কিছু ইমারতও রয়েছে।





রিসোর্টের মত একটা স্থাপনাও চোখে পড়লো তবে এটা আসলেই কোন রিসোর্ট কিনা তা জানতে পারিনি। পুত্রাজায়ায় অত্যাধুনিক একটি কনভেনশন সেন্টার রয়েছে যেটিতে একবার একটি ন্যাম সম্মেলন হয়েছিলো যেটি আসলে বাংলাদেশে হবার কথা ছিলো।




পুরো শহরটি ফাঁকা মনে হলেও শেষ পর্যন্ত কিছু মানুষের দেখা পাওয়া গেলো পুত্রা মসজিদের কাছে এসে। স্থানীয় ও বিদেশী অনেক টুরিস্টই এখানে এসেছেন মালেশিয়ান প্রধানমন্ত্রির কার্যালয় ও পুত্রা মসজিদের অনবদ্য স্থাপনাশৈলী উপভোগ করার জন্যে। এখানে পৌছুতে পৌছুতে জোহরের নামাজের জামাতের সময় পার হয়ে গিয়েছিলো, নয়তো দারুন এ মসজিদে জামায়াতে নামাজ পড়ার সৌভাগ্য হয়ে যেত। তারপরও যোহর আর আসরের নামাজ কসর আদায় করে নেয়া গেলো। এ মসজিদে একজন টুরিস্ট মুসল্লির জন্যে অনেক ধরনের সুযোগ সুবিধা রয়েছে।

পুত্রা মসজিদের ভেতরের অংশ


প্রথমে ঢোকার সময়ই আপনাকে অভিবাদন জানানোর জন্যে আসবেন মসজিদের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি যার কাছ থেকে মসজিদ সম্বন্ধে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারবেন। ওযু করার জায়গাটিতে গোসল করার ব্যবস্থাও রয়েছে। তাছাড়া টুরিস্ট যদি সতর ঢাকার উপযোগী পোষাক না পরে আসে তার জন্যে একটি স্টল থেকে সাময়িক ব্যবহারের জন্যে পরিচ্ছন্ন লম্বা এক ধরনের কুর্তা ও লুঙ্গির ব্যবস্থা রয়েছে। লুঙ্গির ব্যবস্থা অবশ্য্ মালেশিয়ার সব মসজিদ আর ছোট নামাজের স্থানগুলোতেও রয়েছে।



মালেশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
পুত্রা মসজিদের ডানপাশেই অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

গেন্টিং হাইল্যান্ডস
গেন্টিং হাইল্যান্ডের রিসোর্ট এলাকার একটি মডেল

কুয়ালালামপুর থেকে কাছে সেলাঙর প্রদেশের পাহাড়ি এলাকা গেন্টিং হাইল্যান্ডস। এখানে পাহাড়ের উপর বিশাল আকারের একটি রিসোর্ট শহর তৈরী করা হয়েছে। মূলত জুয়াড়িদের জন্যে তৈরী এ জায়গাটিতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বেড়াতে আসেন। কুয়ালালামপুর থেকে প্রায় একশ মাইল দুরে অবস্থিত এ জায়গাটি আসার জন্যে বিশেষ বাসের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া গাড়ি থাকলে তো কথাই নেই।

গেন্টিংএর কেবল কার

গেন্টিং এর পাহাড়টি অনেক ঢালু। সাধারন গাড়িতে করে এখানে ওঠাটা একটু কষ্ট সাধ্য। এই অংশের জন্যে বিশেষ বাসের ব্যবস্থা রয়েছে। অপেক্ষাকৃত নিচু পাহাড়ের ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে সেই বাসে কিংবা কেবল কারে করে গেন্টিং হাইল্যান্ডে রিসোর্টটি আসা যায়।

ফারস্ট ওয়ারলড হোটেল

নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচে বেশি ধারনক্ষমতার হোটেল হিসেবে বিখ্যাত ছবিতে দেখানো রঙ্গীন ফার্সট ওয়ার্লড হোটেলটি। এখানে জুয়াড়িদের জন্যে রয়েছে ক্যাসিনো, এছাড়াও সাধারন দর্শনার্থীদের জন্যে চমতকার সব আয়োজন রয়েছে বিল্ডিংটিতে।

ফার্সট ওয়ার্লড হোটেলের কনভেনশন হলে প্রতিদিনই কোন না কোন আয়োজন থাকে দর্শনার্থীদের জন্যে। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত এন্টারটেইনারদের এসব আয়োজন উপভোগ করার জন্যে কোন ফি দিতে হয়না।

বাটু কেইভস


গেন্টিং থেকে ফিরতে ফিরতে যথেষ্ট রাত হয়ে গেল। ফেরার পথে বাটু কেইভস এ যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো। কুয়ালালামপুরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হলো এই বাটু কেইভস। গেন্টিং থেকে কুয়ালালামপুরে ফেরার পথেই বাটু কেইভস পরে। তাই এখানটা ঘুরে যেতে খুব বেশি সময় নষ্ট হলো না।





এটি মূলত তামিল দের একটি তীর্থ স্থান। প্রতিদিনই তামিলগন এখানে প্রার্থনা ও নিজেদের সম্পদের শুভকামনার গুরুদের কাছে আসেন।

বাটু কেইভস থেকে হোটেলে ফিরে সেদিনের মত ঘুরাঘুরি শেষ হলো। কুয়ালালামপুরের চারপাশের সবগুলো দর্শনীয় জায়গা ও শখানেক হোটেল ও রেস্তোঁরায় ঘুরাঘুরির জন্যে আরেকটি চমতকার সার্ভিস চালু রয়েছে এখানে। একে বলা হয় "হপ ইন হপ অফ" বাস সার্ভিস। দোতলা ছাদখোলা এক ধরনের বাস যেগুলোর অনেকগুলো স্টপেজ রয়েছে। যেকোন একটি স্টপেজ থেকে বাসে উঠে টিকেট সেই টিকেট দিয়ে একদিন বা দুইদিন ধরে কুয়ালালামপুর ঘুরাঘুরি করা যায়। নির্ধারিত একদিন বা দুইদিনে যেকোন সময় যেকোন স্টপেজ থেকে বাসে চড়ে পরের গন্তব্যে যাওয়া জন্যে আর কোন টিকেট লাগবে না। এই লিংক থেকে এ সার্ভিস সম্বন্ধে আরো বিস্তারিত জানতে পারবেন: http://www.myhoponhopoff.com

Wednesday, May 27, 2015

মালেশিয়া ভ্রমন - ৩ : কুয়ালালামপুর ( প্রথম দিন ) | KLIA2, KL Sentral, Jalan Ampang

KLIA2 plane ground

কুয়ালালামপুরে যখন পৌছলাম তখন স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে পাঁচটা। রাত জাগা আমার স্বভাববিরুদ্ধ কাজ, তবু পুরো ফ্লাইটের সময়টায় জেগে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। ঢুলু ঢুলু চোখে প্লেন থেকে নেমে ভারী ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে নিয়ে করিডোর ধরে এগিয়ে সিড়ি দিয়ে এরাইভাল হল এসে পৌছলাম। অনাকাঙ্খিত ভাবে সেখানে চার পাঁচ জনের একটা ইমিগ্রেশন পুলিশের দলকে কড়া মুখ-চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমাদের ফ্লাইটের প্রত্যেক যাত্রীকে পথ আগলে পাসপোর্ট চেক করতে শুরু করলো। যারা প্রথমবারের মত মালেশিয়ায় এসেছে তাদের পাসপোর্টটা রেখে দিয়ে সবাইকে একপাশে লাইন করে দাড় করিয়ে দিলো। স্বাভাবিকভাবে আমিও এদের দলে পড়ে গেলাম, আর আশু মহাঝামেলার অপেক্ষা করতে লাগলাম।

ভীনদেশী পর্যটকরা যখন সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো তখন এই জনা পঞ্চাশেক নারী-পুরুষ-শিশুকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হচ্ছিলো। বিদেশ ভ্রমনে বের হলে প্রথম প্রথম অবশ্যই মনে হবে যে, বাংলাদেশী হয়ে জন্মানোটা কতটা অসম্মানজনক। যদিও আমি বিশ্বাস করি আমাদের এই অসম্মানজনক জীবনের জন্যে আমরা দায়ী নই, বরং আমাদের নেতারাই দায়ী। মালেশিয়া, ইউএসএ কিংবা ইউকে তে গেলে আপনি দেখতে পাবেন দেশের সম্পদ চুরি করে এদেশের মন্ত্রী-এমপি আর আমলা কি পরিমান সম্পদ জমা করেছে। আমাদের সম্পদ আমাদের মধ্যে সমান / যৌক্তিকভাবে বন্টন না করে নিজেরা খেয়ে দেয়ে ফুলে ফেঁপে গিয়েছে। বাংলাদেশের এম্বাসীগুলো প্রবাসে থাকা বাংলাদেশীদের কে সামান্য সহায়তা তো দুরে থাক পারলে দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয়। যে দেশের মানুষ তাদের নেতা আর আমলাদের কাছ থেকেই অত্যাচারের শিকার হয়, সেদেশের মানুষের প্রতি অন্য কোন দেশ কখনোই সম্মান দেখাবে না।

লাাইন ধরে ইমিগ্রেশন পুলিশের পেছন পেছন একটা ঘরের কাছে এসে দাঁড়ালাম। ঘরটিতে বসার ব্যবস্থা রয়েছে, তবে এত মানুষের জন্যে যথেষ্ট নয়। তাই অর্ধেকের মত যাত্রী বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলো আর বাকি অর্ধেক ভেতরে বসার সুযোগ পেলো। অনেকক্ষন পর ডাক এলো, কাউন্টারে মহিলা একজন অফিসার বসে ছিলেন, তিনি আমার পাসপোর্টটা চেক করলেন, আর ভ্রমনের কারন জানতে চাইলেন। সাথে কত ডলার নিয়ে এসেছি এবং কোথায় কোথায় যাবো ও কতদিন থাকবো তাও জানতে চাইলেন। তারপর রিটার্ন টিকেট দেখে ছেড়ে দিলেন। ইমিগ্রেশন পার হয়ে বেরুতে বেরুতে সাতটা বেজে গেলো। কুয়ালা লামপুরে সূর্যোদয় হয় সাতটার একটু পরে, তাই ফ্রেশ হয়ে ওজু করে নিয়ে নামাজের একটা ঘরে ঢুকে পড়লাম, ফজরের নামাজ আদায় করে কিছুক্ষন বসে রইলাম, সারাটা দিন হাতে রয়েছে এবং আজকের দিনের জন্যে আমার কোন পরিকল্পনা নেই। তাই কিছুক্ষন কোরআন শরীফও পড়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করলাম। মালেশিয়ায় এলে আপনাকে অবশ্যই কিছু জরুরি মালেশিয়ান ভাষা শিখে নিতে হবেে, যেগুলো বিভিন্ন জায়গায় বেশ কাজে দেবে। মালেশিয়ানরা ইংরেজী বর্নমালা ব্যবহার করে কিন্তু ইংরেজী ভাষা খুব বেশি ব্যবহার করে না। বিভিন্ন সাইনবোর্ডে মালেশিয়ান ভাষাতেই সব কিছুর ডিরেকশন দেয়া থাকে। টয়লেট, নামাজের জায়গা কিংবা প্রবেশ/প্রস্থানের রাস্তা'র মালেশিয়ান শব্দ গুলো জেনে রাখা উচিত। নিচে কয়েকটি শব্দের মালায় ভাষায় অর্থ দিয়ে দিলাম:

১. টয়লেট: Tandas
২. নামাজের জায়গা: Surau
৩. বাহির: Keluar

Shaheed at KLIA2


KLIA2 একটা বেশ বড় এয়ারপোর্ট। এর তিনটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশটিকে বলা হয় "ট্রান্সপোর্টেশন হাব", চারতলা বিশিষ্ট এই অংশ রয়েছে কার পার্কিং, বাস ট্রান্সপোর্ট, ট্রেইন ট্রান্সপো্র্ট (KLIA Express) এবং রাত্রী যাপনের জন্যে হোটেল। দ্বিতীয় অংশটিকে বলা হয় "গেটওয়ে", এখানে পাবেন দেশি বিদেশী বিভিন্ন ব্রান্ডের পোষাক, ইলেক্ট্রনিক্স পন্য, চকলেট, খাবার দোকান ইত্যাদি। মালেশিয়ায় শপিংএ এলে ভুলে কেনেননি এমন জিনিসগুলো এখান থেকে কিনে নিতে পারবেন। টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে গেটওয়েতে ঢুকতেই মোবাইল ফোনের সিম কার্ড ও রিচার্জ করে নেবার দোকান পেয়ে যাবেন। বন্দরের তৃতীয় অংশটির নাম হলো "টারমিনাল", এরাইভাল, ডিপার্চার ও ইমিগ্রেশন সবকিছু মিলে টারমিনাল বিল্ডিং।

সময় হাতে আছে, তাই এয়ারপোর্ট টা বেশ আয়েশ করে কয়েকবার ঘুরে দেখলাম। রাতে না ঘুমানোয় একটুখানি ক্লান্তি লাগছিলো, আর সকাল বেলা ক্ষুধাটাও একটুখানি দুর্বল করে দিচ্ছিলো। একলা একলা রেস্টুরেন্টে যাবার অভিজ্ঞতা আমার নেই বললেই চলে, সত্যি বলতে খাবার কেমন করে অর্ডার করতে হয় সে বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুবই কম। বন্ধুদের মতে বিদেশ গেলে আমি শুধুমাত্র খাবার কিনতে না পেরে ক্ষুধায় মারা যাবো। ওদের সকলের ভবিষ্যদ্বানীকে ভুল প্রমান করে একটা রেস্টুরেন্টে খাবারের অর্ডার করে ফেললাম। আন্দাজে ছবি দেখিয়ে একটা খাবারের অর্ডার করেছি, খাবার যেটা আসলো সেটা দেখে চোখ চড়কগাছ হয়ে গেল। ছোট্ট একটা কি যেন দিলো, আর এত্তোগুলো টাকা নিয়ে গেলো। খেয়ে যে কিছুতেই পেট ভরবে না তাতে শিওর হয়ে আস্তে আস্তে খেতে লাগলাম।

বিমান বন্দর থেকে কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার প্রায় ৫৫-৬০ কি.মি. দুরে। বন্দরের ট্রান্সপোর্টেশন হাব থেকে পছন্দ মত যেকোন একটি বাহনে করে আপনি শহরের কেন্দ্রে পৌছে যেতে পারেন। সবচে দ্রুতগামী বাহন হলো ট্রেন যা "KLIA Express" নামে পরিচিত। এটি মাত্র ২৮ মিনিটে আপনাকে পৌছে দেবে  "KL Sentral" (শহরের কেন্দ্রে) এ। এ পরিবহনে আপনার খরচ হবে প্রায় ৩৫ রিঙ্গিত। এছাড়া আছে ট্যাক্সি, যা সবচে খরচবহুল পরিবহন। আপনি যদি নিজে ড্রাইভ করতে পারেন তবে বন্দরের নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে "এয়ার এশিয়া"র রেন্ট-এ-কার সার্ভিস থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে ৬, ১২ ঘন্টা বা ২৪ ঘন্টার জন্যে আপনি খুব সস্তায় গাড়ি ভাড়া করতে পারবেন। যদি জরুরি কাজ সেরে ঐদিন বা তার পরদিন বিমান বন্দরে ফেরত আসার পরিকল্পনা থাকে শুধু সেক্ষেত্রেই এই পরিবহন ব্যবস্থাটি আপনি গ্রহন করতে পারেন। এছাড়া সবচে কম খরচের পরিবহন ব্যবস্থা হল বাস। বাস ভাড়া প্রতি জনের জন্যে ১০ রিঙ্গিত, রাউন্ডট্রিপ ভাড়া মাত্র ১৬ রিঙ্গিত। বাসে সময় লাগবে ১ ঘন্টার কিছুটা কম। বন্দরের সবচে নিচ তলায় বাসের টিকেট কাটা যায়, সেখানকার গেট দিয়ে বেরুলেই বাসকে অপেক্ষমান দেখতে পাওয়া যাবে। ২৪ ঘন্টাই এ সার্ভিস চালু থাকে, প্রতি ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর পর বাস ছাড়ে বন্দর থেকে।

বাস স্টেষন, KLIA2
বাসে করে KL Sentral এ আসতে প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের মত সময় লাগলো। বাসে খানিকটা ঘুমিয়ে নিলাম, বাকিটা সময় আদনানের সাথে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দিলাম। সৌভাগ্যক্রমে আদনান সেই সকালেই জরুরী কাজে কুচিং থেকে কুয়ালালামপুর এসেছে, আমি যখন নাস্তা করতে বসেছি ঠিক তখনই ও প্লেন থেকে নেমে আমার সাথে দেখা করে। তারপর থেকে সারাদিন ওর সাথেই ছিলাম।


KL Sentral জায়গাটা অনেকটা আমাদের ফার্মগেট কিংবা গুলিস্তানের আধুনিক ভার্সন। এখান থেকে কুয়ালা লামপুর বা মালেশিয়ার যেকোন জায়গায় যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের পরিবহনের কেন্দ্রীয় স্টেষন এটি, এখান থেকেই সব গাড়ি, ট্রেন বিভিন্ন গন্তব্যের দিকে চলে যায়। বিমান বন্দরের মত এটিও অনেকগুলো তলায় ও অংশে বিভক্ত। বিভিন্ন তলায়, বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ধরনের পরিবহনের স্টপেজ ও টিকেট কাউন্টার রয়েছে। আর মাঝে পুরোটা একটা বহুতল মার্কেট, এখানেও বিভিন্ন ব্রান্ডের খাবার দাবার ও পোষাক আষাকের দোকান রয়েছে।

Adnan at KL Sentral

আমি যেমন তেমন টাইপ একটু নাস্তা করলেও আদনানের নাস্তা করা হয়নি। তাই KL Sentral এর গ্রাউন্ড ফ্লোরে চলে গেলাম যেখানে অনেক ব্রান্ডের খাবার দাবার পাওয়া যায়। ম্যাকডোনাল্ডস এর হ্যাপি আউয়ার ধরার টার্গেট নিয়ৈ সেখানে ঢুকে পড়লাম, বার্গার আর কফি দিয়ে সকালের নাস্তাটা শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ হলো।


আজকের দিনের জন্যে আসলে আমার কোন পরিকল্পনা ছিলো না। সন্ধায় বন্ধুরা কুচিং থেকে এসে পৌছাবে। সারাটা দিন কোন রকমে পার করে দিতে পারলেই বাঁচি। আদনানের জরুরী কাজগুলোয় সঙ্গী হবো, দুপুরে হোটেলে চেকইন করে একটা ঘুম দেব এটাই আপাতত পরিকল্পনা। আদনানকে Ampang Park এ একটা ট্রাভেল এজেন্সীর অফিসে যেতে হবে। KL Sentral থেকে LRT (রেল ট্রান্সপোর্ট) এ করে সেখানে যাওয়া যাবে। স্বয়ংক্রিয় কাউন্টার থেকে LRT এর টোকেন কিনতে পাওয়া যায়। ATM মেশিনের মত যন্ত্রটিতে আপনি টাকার নোট একটা একটা করে ঢুকিয়ে দিতে হয়, নির্ধারিত ভাড়া টুকু রেখে সে বাকি টাকা ফেরত দিয়ে দেবে, আর সাথে দেবে একটা টোকেন।



এই টোকেনটি মেশিন রিডেেবল, LRT এর প্লাটফরম এ ঢোকার সময় গেটে এটি স্ক্যান করে প্রবেশ করতে হয়, আবার যে জায়গায় যাবার জন্যে টোকেনটি নেয়া হয়েছে ঠিক সেই জায়গার প্লাটফরমের বের হওয়ার গেটে এটি স্কান করেই কেবল বের হওয়া যাবে। অন্য কোন স্টেশনে স্ক্যান করা হলে তাতে গেইটের দরজা খুলবে না।  LRT তে বসার কোন ব্যবস্থা নেই। সব যাত্রীকেই দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভ্রমন করতে হয়।

Inside LRT
আম্পাঙ পার্ক একটা কমারশিয়াল এলাকা। এখানে বড় অফিস আদালত ছাড়াও আরো রয়েছে খুব দামী দামী কিছু পাঁচতারা হোটেল, এবং পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারও এখানেই অবস্থিত। এখানকার রাস্তায় উঁচু উঁচু দালানকোঠা দেখা যায়, নিরিবিলি রাস্তায় খুব বেশি ভীড় নেই। সাজানো গুছানো রাস্তায় প্রথমে হাটতে খুব ভাল লাগলেও কিছুক্ষনের মধ্যেই তৃষ্ণায় গলা ফেটে যেতে চাইলো। ত্রিশের বেশি তাপমাত্রার সাথে এখানকার বাতাস প্রচন্ড জলীয় বাষ্পে ভরা। এতে খুব তাড়াতাড়ি শরীর প্রচন্ড ঘামিয়ে যায়, আর তৃষ্ণার তৈরী হয়।

Jalan Ampang, Kuala Lumpur

আদনানের কাজ শেষ হবার পর বুকিত-বিনতাংয়ে চলে এলাম, সেখানে আমাকে হোটেলে পৌছে দিয়ে আদনান চলে গেল। গোসল করে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুতেই ঘুম চলে এল। বিকেলের দিকে আদনানের ফোনে ঘুম ভাঙলো, হোটেল থেকে বেরিয়ে আদনানের সাথে একসাথে একটা বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টে ভাত খেলাম, তারপর হোটেলে ফিরে গিয়ে আবার এক ঘুম। সন্ধায় ঘুম থেকে উঠে মাগরিবের নামাজ পড়ে কম্পিউটার নিয়ে বসতে না বসতেই কুচিংয়ের বন্ধুরা হাজির হয়ে গেল।

এশার নামাজের পর রাতের খাবার আর হাটাহাটির জন্যে বের হলাম সবাই। বের হতেই দেখি বৃষ্টি পড়ছে। কুয়ালা লামপুরে সাধারনত প্রতিদিনই অল্পবিস্তর বৃষ্টি হয়ই। এখানকার বৃষ্টির ধরন হলো এখানে ঝপঝপ করে বৃষ্টি তেমন হয়না, বরং ঝিরিঝিরি করে অনেকক্ষন বৃষ্টি হয়ে আস্তে আস্তে থেমে যায়। দিনে, সন্ধায় কিংবা রাতে কোন না কোন এক সময় বৃষ্টি হবেই। বুকিত বিনতাং এর রাস্তার পাশে তুর্কী একটা রেস্টুরেন্টে রাতে খাবার খাওয়া হলো।
তুর্কি রেস্তোঁরার খাবার দাবার




রেস্টুরেন্ট থেকে যখন বেরোই তখনও ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিলো। বুকিত বিনতাং থেকে পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার খুব কাছেই। হেটে দশ মিনিটের মধ্যেই সেখানে পৌছে যাওয়া যায়। বৃষ্টির কারনে ট্যাক্সি নেয়া হলো, এখানকার রাস্তাগুলো বেশিরভাগ একমুখী হওয়ায় অনেকটা ঘুরে সেখানে যেতে হলো। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের নিচ তলায় একটা মার্কেট রয়েছে,  "Suria KLCC" এর ভেতর খানিকটা ঘোরাঘুরি করে টাওয়ারের চত্বরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। তখনো বৃষ্টি পড়ছিলো। আকাশে মেঘ আর চারপাশের উঁচু বিল্ডিংগুলো মিলে চমতার একটা ল্যান্ডস্কেইপ তৈরি হয়েছে। এ যেন ইট-পাথরের কোন প্রাকৃতিক দৃশ্য।


পেট্রেনাস টুইন টাওয়ার অনেক দিন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচে উঁচু বিল্ডিং হিসেবে পরিচিত ছিলো। জীবনে প্রথমবারের মত শ'য়ের বেশি তলার কোন বিল্ডিং দেখলাম। যদিও বৃষ্টি আর মেঘের জন্যে ভাল ভাবে দেখতে পারছিলাম না। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, পোস্টার আর ছবিতে দেখা এই জাদুকরী বিল্ডিং আমি নিজ চোখে দেখছি, হাত দিয়ে ছুয়ে দেখছি, আর চারপাশে ঘোরাঘুরি করছি।





Jalan Ampang এর রাস্তায় প্রায় আরো একঘণ্টা হাঁটাহাঁটি শেষে হোটেলে ফিরে গেলাম। তারপর ঘুম।
পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের প্রবেশ পথে, ছবিতে বাঁ দিক হতে- মুনতাসীর রশিদ, শাহিদ, ইমরান ও সিয়াম

Tuesday, May 26, 2015

মালেশিয়া ভ্রমন - ২: প্রস্থান (শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর)

Shahjalal International Airport ( Photo Credit: Nahid Sultan )
আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে খুব কাছেই ঢাকার একমাত্র বিমান বন্দর। জীবনে প্রথমবারের মত কবে যে সেই বিমান বন্দরে গিয়েছিলাম সময়টা মনে করতে পারছিনা। ছোটবেলা থেকেই অনেক বার আমাকে সেখানে যেতে হয়েছে। তবে কখনোই বিমানে চড়ার জন্যে নয় বরং গ্রাম থেকে আসা আত্নীয়দের কে "বিমান বন্দর" জিনিসটার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে কিংবা তাদের বিদেশ যাবার সময় তাদেরকে এগিয়ে দেবার জন্যে বারবার সেখানে গিয়েছি।

২০১৩ সালে নেপাল যাবার সময় প্রথমবারের মত বিমান বন্দরটিকে সত্যিকার ভাবে উপভোগ করেছি। আমাদের এই বিমান বন্দরটা মাঝারি সাইজের একটা বিমান বন্দর, দুইটা আন্তর্জাতিক টারমিনাল আছে এখানে, আরেকটা ডোমেস্টিক টারমিনাল আছে। দ্বিতীয় টারমিনাল ভবনটি অপেক্ষাকৃত নতুন, কয়েক বছর আগে এটি তৈরী হয়েছে এবং নতুন আরো একটি টারমিনালের কাজ শুরু হবে কিছুদিনের মধ্যে। ১৯৮০ সাল থেকে পুরোদমে চালু হওয়া এই এয়ারপোর্টের নামকরন হয়েছিলো শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামে। তাঁর নামানুসারে বন্দরের নাম ছিলো "জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর"। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের নামকরনের রাজনীতির চাপে পড়ে প্রায় চৌদ্দশ কোটি টাকা খরচ করে এর নতুন নামকরন হয়েছে। বাংলাদেশ অঞ্চলের অন্যতম ধর্মপ্রচারক শাহজালাল (রহ:) এর নামে বিমান বন্দরের নতুন নাম হয়েছে "শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর"।

মালেশিয়া যাবার জন্যে "মালিন্দো এয়ার" এর টিকেট কেটেছি। এটি সবচে কম খরচে যাত্রীদেরকে কুয়ালা লামপুর পৌছে দেয়। প্রথমবার মালেশিয়া যাবার জন্যে এটি একটি ভুল পছন্দ ছিলো। প্রথমবার মালেশিয়া যাবার সময় "বিমান বাংলাদেশ" অথবা "মালেশিয়ান এয়ার" এর টিকেট কাটা উচিত। এ দুটি বিমান KLIA 1 এ নামে, এটি মালেশিয়ার পুরোন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ব্যাপারে তারা আগে থেকেই অভ্যস্ত, যাত্রীর জন্যে ঝামেলা কম। অপরদিকে মালিন্দো নামে KLIA 2 তে, এই বিমান বন্দরটি মালেশিয়ার ডোমেস্টিক বন্দর হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে, আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ব্যপারে তাদের অভিজ্ঞতা কম হওয়ায় অনেক যাত্রীই বেশ ঝামেলায় পড়ে যেতে পারেন। তবে, আপনার মালেশিয়ায় যাওয়ার কারনটি যদি যৌক্তিক হয়, আর আপনি যদি কনফিডেন্ট থাকেন তবে প্রথমবার ভ্রমনে এটা কোন সমস্যাই না। অল্প বাজেটে ভ্রমনের স্বার্থে অভিজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করেই মালিন্দোর টিকেট কিনে ফেলেছিলাম।

মালিন্দোর বিমানটি ছাড়ে রাত ১১ টার সময়। প্লেন ছাড়ার কমপক্ষে আধঘন্টা আগে আপনাকে চেক ইন করতে হবে, এবং লাগেজ চেকইন করাতে হবে (যদি থাকে)। তবে চেকইন শুরু হয় যাত্রার তিনঘন্টা আগে থেকেই। ঢাকার যেই ট্রাফিক জ্যাম কন্ডিশন তাতে যাত্রার সময়ের কমপক্ষে তিনঘন্টা আগে বাসা থেকে বের হওয়া উচিত। যদিও রাত নয়টার পর রাস্তা বেশ ফাঁকা থাকে আর আমার বাসাও বন্দর থেকে খুব বেশি দুরে নয়, তাই একটু দেরী করে বেরুলেও আমার জন্যে সমস্যা হতো না। তারপরও একলা একলা প্লেনে ভ্রমন এটিই প্রথম, তাই কোন রিস্ক নিতে চাইলাম না, একটু আগে আগেই বেরিয়ে গেলাম। সাড়ে আটটা নাগাদ বিমান বন্দরে পৌছে যেতে পেরেছি।

অভিজ্ঞ ফটোগ্রাফার ট্যুরিস্ট বন্ধুরা ডিএসএলআর ক্যামেরা সংক্রান্ত একটা চমতকার পরামর্শ দিয়েছিলো। আপনি যদি ডিএসএলআর ক্যামেরা সাথে নিয়ে ভ্রমনে যান তবে এ তথ্যটি আপনার কাজে লাগবে। ডিএসএলআর যেহেতু বেশিরভাগ মানুষই প্রফেশনাল ক্যামেরা হিসেবে ব্যবহার করেন। সে হিসেবে মালেশিয়া থেকে ফেরার সময় এ ধরনের ক্যামেরার জন্যে আমদানী শুল্ক দিতে হয় যদি তা দেশের বাইরে থেকে কেনা হয়। অতএব, আপনি যদি সাথে করে ডিএসএলআর নিয়ে যেতে চান তবে সাথে যথেষ্ট প্রমানপত্র রাখতে হবে যাতে প্রমান করতে পারেন এটি বাংলাদেশ থেকেই কেনা হয়েছে, কিংবা এটি আপনার ব্যবহার করা পুরোনো ক্যামেরা। তাহলে ফেরত আসার সময় এর জন্যে নতুন করে আবার শুল্ক দিতে হবে না। ক্যামেরাটি যদি দেশ থেকে কেনা হয়, তবে কেনার সময়কার রিসিপ্টটি সাথে রাখতে পারেন। রিসিপ্ট না থাকলে সেক্ষেত্রে বিমান বন্দরে প্লেনের চেকইন করার আগেই নিচ তলার শুল্ক কাউন্টার থেকে ক্যামেরাটির জন্যে পাসপোর্টে একটি ডিক্লেয়ারেশন নিয়ে নিতে পারেন। সেটি দেখালে ফেরত আসার সময় আপনার ক্যামেরার জন্যে শুল্ক বিভাগ আর কোন ধরনের চার্জ করবে না। তবে আপনার ক্যামেরাটি যদি যথেষ্ট পুরোন হয় (১-২ বছরের ব্যবহৃত), অথবা সেটি সাধারন ডিজিটাল ক্যামেরা হয় তাহলে ক্যামেরা নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। তাছাড়াও দেশের বাইরে থেকে নতুন কিনলেও ক্যামেরাটি যদি বিক্রি করার উদ্দেশ্যে না কিনে আপনি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতে নিয়ে আসেন সেক্ষেত্রেও হয়তো আপনাকে শুল্ক দিতে হবে না। তবে যেটি করতে হবে, সেটি হলো ক্যামেরাটি বাক্স থেকে খুলে নিয়ে সাধারন ক্যামেরা ব্যগে নিয়ে আসতে হবে।

বন্দরের টারমিনাল -২ এ ঢুকে মালিন্দোয় চেকইন করে, ব্যাকপ্যাকে একটা স্টিকার (হ্যান্ড লাগেজ) লাগিয়ে নিয়ে ইমিগ্রেশনের জন্যে দাঁড়িয়ে গেলাম। অভিজ্ঞদের মতানুসারে ইমিগ্রেশন খুবই ভয়ংকর জায়গা, তাঁদের মতে ইমিগ্রেশন অফিসাররা খুবই খারাপ এবং তারা যেকোন সময় যেকোন ধরনের ঝামেলায় ফেলে দিতে পারে। অভিজ্ঞদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, এখনকার ইমিগ্রেশন সিস্টেমটা আগের মত আর ভয়াবহ নেই। এম্বারকেশন কার্ড পুরন করে নির্দিষ্ট লাইনে দাড়িয়ে গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ হয়ে যায়। লম্বা লাইন ম্যানেজ করার জন্যে যথেষ্ট পরিমান লোকবল রয়েছে বন্দরের। সেই সাথে একজন সুপারভাইজার থাকেন যিনি আপনাকে তথ্য দিয়ে সব ধরনের সাহায্য করবেন। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা কম্পিউটারে আপনার ডিজিটাল পাসপোর্টটি স্ক্যান করে আর ফেস রিকগনিশন সফটওয়ার দিয়ে খুব দ্রুত আপনার তথ্য যাচাই করে ছেড়ে দেবেন। দুবারের অভিজ্ঞতায় আমার কখনোই হয়রানীমূলক কোন কিছু চোখে পড়ে নি।

ইমিগ্রেশন পার করে এবার প্লেনে উঠার পালা। ছোটবেলা থেকেই আমি প্রচন্ড রকমের উচ্চতাভীতিওলা মানুষ। পার্কে গিয়ে উচ্চতার ভয়ে কখনো রোলার কোস্টারে উঠিনি। পাঁচতলা বাসার বারান্দায় পর্যন্ত যেতে ভয় লাগে। আকাশে যখন প্লেন উড়তে দেখি তখন নিচে থেকে প্লেনের উচ্চতা চিন্তা করে ভয় পেয়ে যাই। আর প্লেনের ভিতর বসে এত উপরে দিয়ে এতদুর উড়ে যাব ভাবতে পুরো শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছিলো। এশার নামাজ পড়ে খানিকটা নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলাম। বিমান বন্দরের অন্য যাত্রীদের সাথে আলাপ করে প্লেনের কথা ভুলে থাকার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে প্লেনে উঠে পড়লাম। যা থাকে কপালে।

প্লেনে উঠার আগেই আমি সাধারনত প্রাকৃতিক আবেদনগুলোর একটা ব্যবস্থা করে নেই। যদিও প্লেনে ভাল টয়লেট আছে, কিন্তু তারপরও প্লেনের ভেতর হেটে হেটে টয়লেটে যাওয়ার মত সাহস আমার নাই। ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর মাত্র চার ঘন্টার পথ, নিজেকে ফ্রি করে নিয়ে প্লেনে উঠে পড়লে এ সংক্রান্ত ঝামেলার আর কোন অবকাশ থাকার কথা নয়। কুয়ালা লামপুরে যাওয়া মানুষের প্রকারভেদ অনেক। অনেক ধরনের মানুষ অনেক অনেক কারনে কুয়ালা লামপুর যায়। নেপালের মত শুধু মাত্র ভ্রমনকারী টাইপে লোক নয়, বরং এবারে প্লেনে হরেক রকমের মানুষ দেখলাম। হরেক রকমের মানু্ষ থাকলেও যে যার মত বসে থাকলে তাদের নিয়ে ভাবার কিছু নেই। কিন্তু আশ্চর্য রকমের দু ধরনের মানুষ দেখতে পেলাম এ যাত্রায়। না চাইলেও বারবার এরা নজরে চলে আসছিলো। এদের মধ্যে একটি ধরন হল বেয়াড়া প্রজাতির মানুষ, আর আরেকটি হলো মনোযোগ প্রত্যাশী নার্ভাস মানুষ।

বেয়াড়া প্রজাতির মানুষগুলোকে শতবার মানা করার স্বত্ত্বেও তারা তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ তো দুরের কথা, অনর্গল ফোনে কথা বলে যাচ্ছিলো। টেকঅফের সময় সাধারনত সাথে থাকা মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেয়ার জন্যে ঘোষনা দেয়া হয়, এবং এটেন্ডেন্সরা প্রত্যেকটি সারিতে দাড়িয়ে ফোন বন্ধের ব্যপারটি নিশ্চিত করেন। কিন্তু দুতিনজন মানুষ পাওয়া গেল যাদেরকে বারবার অ্যাটেন্ডেন্স এসে রিকোয়েস্ট করার পরও ফোনে কথা বলা চালিয়ে যাচ্ছিলো। দুয়েকবার তো তাঁরা এসে খানিক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে ফোন বন্ধ হওয়া নিশ্চিত করে গেলো, তারপরও এই বেয়াড়া লোকগুলো ঠিকই আবার ফোন চালু করে পুনরায় ফোন করে কথা শুরু করেছে।

প্রত্যেক প্লেন জার্নিতে আপনি কমপক্ষে একজন পুরুষ এবং একজন মহিলাকে পাবেন যারা প্লেনে প্রকৃতির ছোটখাট প্রত্যেকটি ডাকে সাড়া দেবার জন্যে বারবার টয়লেটের দিকে ছুটতে থাকবে। মালেশিয়া ভ্রমনে মোট ছয়বার প্লেনে উঠে বেয়াড়া লোক সব সময় না পেলেও এই প্রকৃতিপ্রেমীদেরকে সবসময়ই পেয়েছি। লুজ মোশন কিংবা ব্লাডার সমস্যার কারনে যদি তারা ঐ দুর্গতির মধ্যে পড়ে গিয়ে থাকেন তাহলে তা অত্যন্ত দু:খজনক, কিন্ত নার্ভাসনেস যদি ঐ অবস্থার মূল কারন হয় তবে তা আরো বেশি দু:খজনক। যাহোক, একজন নারীকে দেখলাম উনি প্রত্যেকবার টয়লেটে যাবার সময়া সবার নজর আকর্ষন করে এমনভাবে হেসে হেসে হেটে যাচ্ছিলেন যেটা দেখে মনে হচ্ছিলো কোন রকস্টার যেন স্টেজে উঠছেন। চারঘন্টার ভ্রমন বেয়াড়া আর প্রকৃতিপ্রেমীদের আচরন দেখে দেখে ভালই কেটেছে।

রাতের বেলার এই প্লেন ভ্রমনে আরো দুটো আশ্চর্য জিনিস আমাকে জাগিয়ে রেখেছিলো। সেগুলো হল "চাঁদ" আর "বিজলী"। প্লেনের ডানার পাশ দিয়ে চাঁদটি এমভাবে ঝুলে ছিলো যেন মনে হচ্ছিলো আমি চাঁদের উচ্চতায় পৌছে গেছি আর চাঁদটা আমার পাশে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। আর চাঁদের আলোয় নিচে গাঁঢ় ছাই রঙের মেঘ দেখেছি, সেই মেঘের ঘর্ষনে তৈরী হওয়া বিদ্যুত চমকানোর দৃশ্যও দেখেছি। আজীবন বিদ্যুত চমকানোর দৃশ্য দেখার জন্যে উপরের দিকে তাকাতে হয়েছে, আর এই প্রথমবারের মত জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বিদ্যুত চমকানোর দৃশ্য দেখলাম। চাঁদ আর বিদ্যুত চমকানো দেখতে দেখতে কখন যে চার ঘন্টা পার হয়ে গেলো আর কুয়ালালামপুরে পৌছে গেলাম তা বুঝতেই পারলাম না।

Saturday, May 16, 2015

মালেশিয়া ভ্রমন - ১: ভিসা পাওয়া


ডিশ চ্যানেলগুলোয় ট্রাভেলারদের ভ্রমনের ডকুমেন্টারি দেখে দেখে মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে যে আমিও এদের মত হয়ে যাই। ট্রাভেলিং আমার স্বভাবের মধ্যে আছে কিনা জানি না, তবে যখন কোথাও বেড়াতে যাই তখন সময়টা আমার খুবই ভাল কাটে। ঘর থেকে বেরিয়ে ত্রিশ থেকে চল্লিশ কিলোমিটার পার হলেই মনে হয় যেন বন্দী জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি, কিন্তু আবার একদিন দুদিন পার হলেই নিজের ঘরের প্রতি তীব্র আকর্ষন অনুভব করি।

একলা একলা ভ্রমন জিনিসটা অনেকেই পছন্দ করেন, কিন্তু আমি সেটা পারি না। একজন বোকা সোকা টাইপের মানুষ হওয়ায় কোথা থেকে সব আয়োজন শুরু করবো, কোথায় থাকব, কি করব, কি খাব এসব কিছু মাথার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে যায়, নার্ভাস ব্রেকডাউনে পড়ে যাই। দেশ ছেড়ে বিদেশে একলা একলা রওনা দেয়া তো স্বপ্নেরও বাইরে। এর আগে দেশের বাইরে বলতে "নেপাল" গিয়েছিলাম, সেই যাত্রায় সহযাত্রী ছিল তিনজন, তাঁরাই সবকিছু আয়োজন করেছিলো। মালেশিয়া যাত্রায় কোন সহযাত্রী পাওয়া গেলনা, কিন্তু তারপরও কেমন করে যেন সবকিছু গুছিয়ে নিজে একলা একলা মালেশিয়া রওনা দিয়ে দিলাম।

এত জায়গা থাকতে মালেশিয়ায় কেন? বছর খানেক হলো বেশ কিছু বন্ধু পড়াশোনার জন্যে মালেশিয়ার সারাওয়াক প্রদ্রেশের কুচিং শহরে গিয়েছেন। প্রথমত, তাঁদের দাওয়াতেই মালেশিয়ায় ভ্রমনে আগ্রহের সূচনা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ থেকে যেসব দেশের ভিসা সহজে পাওয়া যায় তারমধ্যে অন্যতম হলো মালেশিয়া। তৃতীয়ত, মালেশিয়া একটি আধুনিক ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ যা খুব তাড়াতাড়ি একটি উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশি হিসেবে আমার অনেক কিছু শেখার আছে বলে সেখানে যাবার ব্যাপারে আগ্রহটা প্রবল হয়েছে। চতুর্থত, আমার মত গরীব ট্রাভেলারের জন্যে সস্তায় উন্নত দেশ দেখে আসার সুযোগ আর কোথাও নেই।

ভ্রমনের পরিকল্পনাটা শুরু হয়েছে যাত্রার প্রায় তিন চারমাস আগে থেকেই। সহযাত্রী কাউকে পাওয়া যায় কিনা, তাদের জন্যে অপেক্ষা আর মানসিক ও আর্থিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে করতেই কেমন করে যেন তিনমাস চলে গেল। তারপর, অন্যদের জন্যে আর অপেক্ষা না করে ভিসার জন্যে আবেদন করে ফেললাম। মালেশিয়ার ভিসা অপেক্ষাকৃত সহজে পাওয়ার সুযোগ থাকলেও আসলে তা খুব বেশি সহজ নয়। তাদের ভিসার আবেদনের জন্যে কিছু শর্ত রয়েছে। মালেশিয়া ভিসা দেবার ক্ষেত্রে স্টুডেন্ট, ওয়ার্কার ও ব্যবসায়ীদেরকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা ইনভাইটেশন বা কাগজপত্র থাকে যা ভিসা আবেদনের সাথে যুক্ত করে দিতে হয়। ট্রাভেলার বা ভ্রমনেচ্ছুদের ক্ষেত্রে শুধু অবস্থাপন্ন ব্যবসায়ী ও বড় চাকরিজীবিদেরকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

ভ্রমনের জন্যে ভিসার আবেদন মালেশিয়ান এম্বাসী কখনোই সরাসরি গ্রহন করে না। ভিসার আবেদনের জন্যে তাদের পছন্দের বেশ কিছু ট্রাভেল এজেন্সির শরনাপন্য হতে হবে। এম্বাসির রেজিস্টার্ড ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে প্রায় বিশ থেকে তিরিশটি, ভিসার জন্যে আপনাকে অবশ্যই এদের মধ্যে যে কোন একটি এজেন্সীর মাধ্যমে ভিসার আবেদন জমা দিতে হবে

চাকরিজীবি ভ্রমনকারীর ক্ষেত্রে তার অফিসের ছাড়পত্র, চাকরীর নিয়োগপত্রের কপি ও ব্যাক্তিগত ব্যাংক একাউন্টের তিনমাসের স্টেটম্যান্ট ভিসা আবেদনের সাথে যুক্ত করে দিতে হয়। এক্ষেত্রে চাকরীজীবির পদ, বেতন, ছুটির দিনসংখ্যা ও ব্যাক্তিগত ব্যাংক একাউন্টের ব্যালেন্সের পরিমানের উপর ভিত্তি করে মালেশিয়ান এম্বাসী ভিসা দিতেও পারে, কিংবা আবেদন বাতিল করে দিতে পারে। আবার ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ব্যবসায় ব্যবহৃত ব্যাংক একাউন্টের কমপক্ষে তিনমাসের স্টেটম্যান্ট ও সলভেন্সি লেটার জমা দিতে হয় এবং ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের সিল সংশ্লিষ্ট লেটার প্যাডে ভিসার জন্যে লিখিত আবেদন করতে হয়।

এদিকে আমি পড়েছি বিপাকে। আমি তো ব্যবসায়ীও না, আবার চাকরিজীবিও না। বাবা-মার সাথে থাকি, বাবাই সংসার চালায়। আমি ছোটখাট কিছু সফটওয়ার ডেভলপমেন্ট আউটসোর্সিংয়ের কাজ করি, তার সঞ্চয় দিয়ে যদিও মালেশিয়ার ট্রিপের খরচ হয়ে যাবে। কিন্তু কোন ক্যাটাগরিতেই আমার ভিসার রিকোয়ারমেন্ট ফুলফিল হচ্ছে না। এজন্যে ভাগ্যের উপর ভরসা রেখে ভিসা আবেদনের প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য ও শ্রম দিয়ে সাহায্য করেছে বন্ধু রনি(*)।

রনির কথা মত বাবার কাছ থেকে তাঁর ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি, তাঁর ব্যাংক একাউন্টের কয়েকমাসের স্টেটম্যান্ট, সলভেন্সি স্টেটম্যান্ট আর একটা লিখিত ভ্রমনের ব্যয়ভার গ্রহন সংক্রান্ত একটা লিখিত চিঠি নিয়ে নিলাম। গত বছরের শেষ কয়েক মাসের বিভিন্ন প্রজেক্টের বিল সব একসাথে পেয়েছিলাম, সেগুলো সবই ব্যাংকে আমার একাউন্টে রাখা ছিলো আর বাবাও কিছু টাকা জমা দিয়েছিলেন তার সব মিলিয়ে ভাল একটা সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলো। আমার অ্যাকাউনটের হিসেবটাও ব্যাংকের কাছ থেকে স্টেটম্যান্ট হিসেবে নিয়ে নিলাম। তারপর ভ্রমনের কারন জানিয়ে ভিসার একটা আবেদন লিখে, ভিসার ফরম পুরন করে, ছবিসহ একসাথে করে নিয়ে পাসপোর্টসহ রনির কাছে দিয়ে এলাম। রনিই অনেক কষ্টে তার পরিচিত এজেন্টদের কাছে আবেদনটা জমা দেয়ার ব্যবস্থা করলো। পরিচিত বেশ কয়েকজন এজেন্ট আবেদনটা গ্রহন করতে রাজী হয়নি, পরে একটা প্রতিষ্ঠান অনেক রিকোয়েস্টের পর শর্তসাপেক্ষে আবেদনটা প্রসেস করতে রাজী হয়। ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি আবেদনই গৃহীত হবার ব্যপারে সম্পুর্নভাবে সংশ্লিষ্ট এমবাসির ইচ্ছার উপর নির্ভর করে, ভিসা পাওয়াটা সবার জন্যেই অনিশ্চিত, আর আমার আবেদনপত্রটা বাতিল হয়ে যাবার ব্যপারে আমি পুরোপুরিই নিশ্চিত ছিলাম, কিন্তু ভাগ্য ভাল, মালেশিয়ান এম্বাসী প্রায় এক সপ্তাহ পরে তিনমাসের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসাসহ আমার পাসপোর্টটা ফেরত দিয়েছে। ভিসা পেয়ে ভ্রমনের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্য হলো, এবার বাকি রইলো টিকেট, হোটেল আর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা। উল্লেখ্য ভিসা পাবার প্রায় চল্লিশ পরে আমি মালেশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলাম।


------------------------------------- ------------------------- --------------------------------
* যারা মালেশিয়ায় বেড়াতে কিংবা পড়তে বা অন্য কোন ভিসায় যেতে আগ্রহী, তাঁদেরকে বলব কনসাল্টেন্সির জন্যে আপনারা চাইলে THR এর কাছে যেতে পারেন। এ প্রতিষ্ঠান মালেশিয়া ছাড়াও যে কোন দেশের ভিসা, টিকেটিংএর ব্যপারে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের মাধ্যমে আপনাকে সহায়তা করতে পারবে। তাদের দেয়া তথ্য হয়ত আপনার বিদেশে বেড়াতে কিংবা যে কোন ভিসার ব্যাপারে অযাচিত হয়রানীর হাত থেকে বাচাতে পারে। ঢাকার বনানীতে ওল্ড ডিওএইচএস এর চমতকার লোকেশনে তাদের অফিস, তাদের সার্ভিস গ্রহন না করেও শুধুমাত্র পরামর্শের জন্যে সেখানে যেতে পারেন। সাধারন তথ্য ও পরামর্শের জন্যে ওরা হয়তো কোন চার্জ তো করবেই না, বরং তাদের অফিসে চমতকার চা বানানো হয়, ফ্রিতে তাও খেয়ে আসতে পারবেন।

* THR International Immigration Service
ফেসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/thr.immigration
স্বত্বাধিকারী: তামিম হোসেন (ফেসবুক প্রোফাইল: https://www.facebook.com/thrbdnet)
যোগাযোগ:
  • ফোন: 01791028730
  • House # 05, (2nd Floor), Flat # 2C, Road # 04, Old DOHS, Banani
  • Dhaka Dhaka 1213
  • Bangladesh


Friday, February 6, 2015

অবরুদ্ধ রাজনীতি, অবরুদ্ধ দেশ

বাংলাদেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক জোট কর্তৃক সর্বোচ্চ সময় ধরে অবরোধ নামক রাজনৈতিক কার্যক্রম চলছে। সারাদেশ গত একটি মাস ধরে মন্থর হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন বাড়ছে সহিংসতায় ও পুলিশি আক্রমনে নিহতের পরিমান।

৫ই জানুয়ারির ভোটার বিহীন নির্বাচনের পর প্রায় এক বছর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠান্ডা থাকলেও নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে গরম হয়ে উঠে রাজনৈতিক অঙ্গন। একতরফা নির্বাচনকে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন আক্ষা দিয়ে সরকার দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তি নির্বাচনের ঘোষনা দেবার কথা থাকলেও সুযোগ বুঝে নিজেদের ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার চেষ্টা চরিত্র শুরু করে ক্ষমতাসীনগন। মধ্যবর্তি নির্বাচন না দেবার কারন হিসেবে তারা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিমত্তার দুর্বলতা ও দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে। নির্বাচন প্রত্যাশি রাজনৈতিক দলগুলো পুরো এক বছর নিজেদের ঘর গুছানো ও জনসমাবেশের মত ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। এদিকে সরকারের এক বছর পূর্তিকে সামনে রেখে সরকার ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বিরোধী দলগুলোর বেশ কয়েকটি সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বাধার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ৫ই জানুয়ারীতে তাদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ৪ই জানুয়ারী থেকে পরের প্রায় ১৩দিন ধরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। মাস পার হয়ে গেলেও এখনো তিনি তাঁর অফিসেই অবস্থান করছেন, এখনো তাঁর অফিসে নেতাকর্মী ও কর্মচারীদের আসা যাওয়ার উপর সরকারী নিয়ন্ত্রন রয়েছে। ৫ তারিখের সমাবেশে যাবার পথে তাঁকে আটকে দেয়া হলে তিনি লাগাতার অবরোধের ঘোষনা দেন যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। অবরোধের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় হরতাল কর্মসূচিও হয়ে চলেছে।

অবরোধ কার্যক্রম শুরুর সাথে সাথে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে দাবি করা হয়েছিলো যে দেশের কোথাও কোন অবরোধ কার্যক্রম চলছে না, কিন্তু ব্যবসায়ী ও অন্যান্য মহল অবরোধে তাঁদের সকল কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছে। অবরোধ ও আন্দোলনের কোন অস্তিত্ব নেই বললেও সরকার ঠিকই এ আন্দোলন দমাতে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর প্রধান নেতাদেরকে বন্দী কিংবা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। আন্দোলনকারী/পিকেটার দেখলে সাথে সাথে গুলি করে হত্যা করার ব্যাপারে পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য সকল সরকারী বাহিনীকে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের উচ্চমহল থেকে আদেশ দেয়া হয়েছে। প্রতিদিনই সারাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আন্দোলনকারীদের গুলিবিদ্ধ লাশের অস্তিত্ব মিলছে। বড় নেতা যারা জেলের বাইরে আছে তারাও জীবন বাচাতে গা ঢাকা দিয়ে আছে।

সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় অবরোধ কে কেন্দ্র করে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে চৌদ্দগ্রাম, গাইবান্ধা ও যাত্রাবাড়িতে ভয়াবহ ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। বড় শহরগুলোতে কড়া পুলিশি পাহারার পাশাপাশি সারাদেশের সকল হাইওয়েতে নিরাপত্তার জন্যে বিজিবি, আনসার ও পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। তারপরও কোথাও না কোথাও গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছেই। বেশ কিছু টিভি চ্যানেলের রিপোর্ট অনুযায়ী পুলিশের কড়া পাহারাকে এড়িয়ে পিকেটাররা বিভিন্ন জায়গাতে রাস্তা আটকে ফেলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এই ধরনের নাশকতা ছাড়াও বিচিত্র ধরনের কিছু নাশকতা ঘটেছে। চৌদ্দগ্রাম, গাইবান্ধা সহ বেশ কিছু জায়গায় পুলিশ-বিজিবির নাকের ডগা দিয়ে পেট্রোল বোমা দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে অনেক নিষ্পাপ মানুষকে যেখানে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ বা অন্য বাহিনীগুলো কাউকেই গ্রেফতার করেনি। অথচ এ ঘটনাগুলোয় বেগম জিয়া সহ অনেক জাতীয় নেতাকে আসামী করে মামলা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে পেট্রোলবোমা ও বোমা তৈরীর সরঞ্জামসহ গ্রেফতার হওয়া অনেকেই ছাড়া পেয়ে গেছে যাদের সাথে ক্ষমতাসীন দলের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অনেক সংবাদমাধ্যম দাবী করেছে।

নির্বাচন নিয়ে জাতীয় সংলাপের প্রতি বারবারই ক্ষমতাসীনগন অনীহা প্রকাশ করছেন। দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি'র আদর্শ, সাংগঠনিক কাঠামো ও নীতিগতভাবে খুব বেশি পার্থক্য নেই। দুদলই কখনো না কখনো ইসলামপন্থী ও বামপন্থী দলগুলোর সাথে জোট বেধে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছে। দুদলের বিরুদ্ধেই একই ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, আর দুদলেই যথেষ্ট পরিমান মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারের উপস্থিতি রয়েছে, এবং এ দুদলই বারবার ক্ষমতায় এসেছে। অপরদিকে বাম বা ডান-পন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ ও সাংগঠনিক কাঠামোর সাথে এ দুদলের আকাশ পাতাল তফাত। কিন্তু এত মিল থাকার পরও প্রধান এ দুটো দল একজন আরেকজনকে সহ্য করতে পারে না, কেউ কাউকে বিশ্বাসও করেনা। দেশে যেই নাশকতার ঘটনাগুলো ঘটছে তা অবশ্যই দেশবিরোধী কাজ, এবং এগুলো দেশবিরোধী শক্তিই করছে। এই দেশবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে প্রথমে তাদেরকে সনাক্ত করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রধান শত্রুকে সনাক্ত করতে হলে অবশ্যই প্রথমে বন্ধুদেরকে কাছে টেনে নিতে হবে। সফলভাবে দেশ পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত কোন রাজনৈতিক দলই দেশের শত্রু হতে পারে না, অতএব আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হলে আমার বিশ্বাস দেশবিরোধী সকল চক্রান্ত অংকুরেই স্তব্ধ হয়ে যাবে। সরকারের বাহিনীগুলোর কাছে যথেষ্ট পরিমান মরনাস্ত্র রয়েছে, তাদেরকে আদেশ দিলে তারা হয়তো দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠিকে হত্যা করতে পারবে, কিন্তু লাশের উপর দাড়িয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা অনেক কষ্টের, যারা ক্ষমতায় থাকবেন তারা তো নিশ্চয়ই মানুষের কাঠামোতেই তৈরী, অতএব আত্নগ্লানি খানিকটা হলেও তাদেরকে টলিয়ে দেবে। কুরআন ও ইতিহাস উভয়ে সাক্ষি যে, কোন অসভ্যই পৃথিবীতে টিকে নেই, টিকে থাকেনা।