লাংকাবির মূল প্লান সব মোটামুটি খতম। আজকে এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে শেষে রাতে আবার কুয়ালালামপুরে ফেরত যাব। সকালে নাস্তা করে এসে প্রথমে ব্যাগগুলো গুছিয়ে নেয়া হলো। তারপর হোটেল থেকে চেকআউট করে সব জিনিসপত্র আগের সন্ধ্যায় ভাড়া করা গাড়িতে তুলে নেয়া হলো। লাংকাবীর সর্বশেষ আকর্ষন "সেভেন ওয়েলস" এ যাওয়া হবে, সেখানে দুপুর পর্যন্ত থেকে লাঞ্চ সেরে আস্তে ধীরে এয়ারপোর্টের দিকে চলে যাওয়া হবে। এয়ারপোর্টের পাশেই চমতকার সীবিচ সেখানে সূর্যডোবাটুকু উপভোগ করে এয়ারপোর্টে ঢুকে পড়া হবে।
সেভেন ওয়েলস এর কার পার্কিং, লাংকাবী
সেভেন ওয়েলস জায়গাটা একটা পাহাড়ের চুড়ায়। অনেক উঁচু এই পাহাড়ে উঠার জন্যে সিড়ি আছে, কিছুদুর উঠার পর সিড়িটা দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে একটা ঝর্না রয়েছে, আর সোজা উপরে গেলে সেভেন ওয়েলসের মূল উত্পত্তিস্থল। সিড়ির শুরুর অংশের চত্বরে বিভিন্ন দোকান পাট রয়েছে।
বামে গেলে বড় একটা ঝর্নার দেখা মিলবে, আর উপরে সেভেন ওয়েলস
প্রথমে সবাই মিলে বামের ট্রেকটা ধরলাম। বাধানো রাস্তা আছে। কিছুদুর গিয়ে আবার নিচের দিকে নেমে গেছে। সেখানে চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা একটা ঝর্না রয়েছে। এ সময় ঝর্নায় পানি কম, কিন্তু গভীরতা আর যতটুকু চওড়া তাতে মনে হয়েছে কখনো কখনো হয়তো ঝর্নাটা খুব উত্তাল হয়ে উঠে।
সেভেন ওয়েলসের ঝর্না
গত কয়েকদিনের টানা ভ্রমনে সবাই যথেষ্ট ক্লান্ত। শুধুমাত্র শাহিদ ভাই ছাড়া, উনি আমাকে নিয়ে সেভেন ওয়েলস জয় করতে ছুটলেন। জায়গাটা অনেক উঁচুতে। আর প্রচন্ড ভ্যাপসা আবহাওয়ায় শরীরের পানি সব খুব তাড়াতাড়ি ঘাম হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে বিশাল আকারের কিছু গাছ দেখলাম।
পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা বিশাল বৃক্ষ
চুড়ায় উঠে আবার হতাশ হতে হলো। এখানেও শুকনো মওসুম চলছে, ওয়েলসের মধ্যে কোন পানি টানি নেই। যদ্দুর মনে হয়, কখনো কখনো এ জায়গায় এত পানি থাকে যে তা সাতটি আলাদা স্রোত ধরে নিচে নেমে যায়, সেই থেকে এর নাম সেভেন ওয়েলস, কিন্তু একটা স্রোতও চোখে পড়লো না।
সেভেন ওয়েলস
জায়গাটা খুবই স্যাঁতস্যাতে এবং পিচ্ছিল। পাশে সাবধানবানী ছিলো, তাই সাবধানে সাবধানে পা চালানোর চেষ্টা করলাম, তবু পিছলা খেয়ে কোনমতে তাল সামলাতে পারলাম। ভাগ্যিস স্রোত নেই, নইলে স্রোতে টেনে নিয়ে যেত।
সেভেন ওয়েলস
নিচে নেমে গিয়ে কিছু খাওয়া দাওয়া করা হলো। চত্বরে নারিকেলের ডাবের চমতকার একটা বরফকুচি দেয়া পানীয় পাওয়া যায় সেটা খেলাম। তারপর কিছুক্ষন বসে জিরিয়ে নিয়ে আবার গাড়িতে চড়ে বসলাম। গাড়িতে এদিক ওদিক খানিক্ষন ঘোরাঘুরি শেষে আরেকটি সৈকতে পৌছুলাম। সেখানেও চমতকার একটা চত্বর আছে, আর এখান থেকে দুরে অনেকগুলো দ্বীপ দেখতে পাওয়া যায়।
কুয়াহ এর কাছাকাছি একটি সৈকত
শেষ বিকেলে এয়ারপোর্টের কাছে চলে এলাম। এয়ারপোর্টের পাশের সৈকতটির বৈশিষ্ট্য হলো এখান থেকে সুর্য ডোবার খুব সুন্দর একটা দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয়রা ও পর্যটকরা এখানে এসে সুর্যাস্ত উপভোগ করতে চলে আসে।
লাংকাবী এয়ারপোর্টের পাশের সৈকত
সুর্যাস্তের সময় সুর্যের লাল আভায় পুরো সৈকত আর আকাশ এক ভিন্ন সাজ নেয়। ব্যাপারটা খুবই ভাল লেগেছে।
লাংকাবির সূর্যাস্ত
সবাই মিলে এয়ারপোর্টে গিয়ে ঢুকলাম। এরমধ্যে আমাদের প্লেন টিকেটের মধ্যেকার একটা ভুল খুজে পাওয়া গেলো। সেটি হলো আমরা টিকেট কেটেছি সেইদিন থেকে ঠিক একমাস পরের একটা ফ্লাইটের, এবং টিকেট পরিবর্তনের কোন সুযোগ নাই। অতএব, ঐ টিকেট বাদ দিয়ে নতুন করে বেশি দামে আবার টিকেট কেনা হলো। এগারোটায় ফ্লাইট ছিলো, বারোটা নাগাদ কুয়ালালামপুরে পৌছে গেছি। সেখান থেকে বাসে কেএল সেন্ট্রাল এবং হোটেলে পৌছুতে পৌছুতে রাত দুটা। তারপর ঘুম।
গতরাতে লাংকাবীতে পৌছে অনেক রাত পর্যন্ত সাগরপাড় আর রাস্তাঘাটে ঘোরাঘুরি করা হয়েছে। এজন্যে ঘুমাতে দেরী হয়েছে, তাই আজকে ঘুম থেকে উঠতেও দেরী হয়ে গেলো। হাতমুখ ধুয়ে সবাই মিলে নাস্তা খেতে বেরুলাম। আমি ছাড়া সবাইই অনেকদিন বর্নিও তে থাকে, তারা অনেকদিন পর কুয়ালালামপুরে এসে দেশী খাবার খেতে পেয়ে মজা পেয়ে গেছে, তাই ওরা এখানেও বাংলাদেশী কিংবা ভারতীয় খাবারের সন্ধানই করতে চাইলো। অনেক খুজে একটা ভারতীয় রেস্টুরেন্ট পেলাম, তার সার্ভিং বন্ধ হয়ে গেছে। পরে মালেশিয়ান ট্রেডিশনাল একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে ডাল-পরাটা টাইপের কি যেন খেলাম, খুব বেশি সুবিধে লাগলো না।
লাংকাবির একটি থাই রেস্টুরেন্ট, রাস্তার পাশে এরকম অসংখ্য রেস্টুরেন্ট রয়েছে
আগের দিনের ভাড়া করা গাড়িটা আছে, শাহিদ সেটায় করে নিয়ে পুরো লাংকাবি চক্কর দেয়ালো আমাদেরকে। দ্বীপের এ মাথা থেকে ওমাথা পুরোটা কয়েকবার দেখে ফেললাম, চমতকার ও আধুনিক একটা দ্বীপ। পুরো দ্বীপে অনেক রিসোর্ট রয়েছে এবং সেগুলোকে এমনভাবে জায়গা দেয়া হয়েছে যে এখানকার সাধারন মানুষদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যাতে খুব একটা প্রভাবিত না হয়। ন্যাটিভদের আবাসিক এলাকাগুলোতে এখনো দ্বীপসূলভ গ্রাম গ্রাম একটা ভাব রয়েছে।
শাহিদ ভাই আমাদেরকে চমতকার একটা জেটিতে নিয়ে গেলো। প্রাইভেট বোটে করে যারা মালেশিয়ায় আসতে চান তারা এখানে ল্যান্ড করতে পারেন। বোটে আসা শখের নাবিক পর্যটকদের জন্যে এখানে ইমিগ্রেশন অফিসও রয়েছে।
নাবিক পর্যটক ও ফিশিং বোটের জেটি
বোটে আসা পর্যটকদের জন্যে ইমিগ্রেশন অফিস
জেটি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে চড়ে এবার চলে এলাম একটা কুমিরের খামারে। জায়গাটা খুবই সুন্দর পুরো এলাাকাটা একটা বাগানের মতন। ভেতরে অনেকগুলো ছোট, বড় জলজ খাঁচায় বিভিন্ন সাইজের কুমির পালা হয়। ভয়ংকর সুন্দর একটা জায়গা।
কুমির খামারের প্রধান ফটক
বাচ্চা কুমিরের গন-খাচা
একটা পুকুরে ভেসে থাকা কুমির
কুমিরের খামার থেকে বেরিয়ে খামার এলাকার ভেতরেই দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়া হলো। এর পরের গন্তব্য কেবল কার। এখানকার কেবল কারটা গেন্টিং এর টার চাইতেও বেশি খাড়া আর ভয়ংকর। একটা পাহাড়ের চুড়ায় গিয়ে থেমেছে যেখানে হিন্দি মুভি "ডন" এর শুটিং হয়েছিলো।
লাংকাবি কেবল কার
কেবল কারের উপরের স্টেষন থেকে ভিউ
কেবল কারের ল্যান্ডিং স্টেষনের ভেতরে একটা থ্রিডি মুভি হল আছে। সেখানে ভয়ংকর একটা রোলার কোস্টার এক্সপেরিয়েন্স এর মুভি দেখানো হয়, কিন্তু মুভিটা খুব বেশি ভালো লাগেনি, অযথা এর জন্যে টিকেট কাটার কোন মানে হয় না। সাথে থাকা একশন ক্যাম দিয়ে কেবল কারের এক্সপেরিয়েন্সটা ক্যাপচার করতে চেয়ে্ছিলেম, নিচের ভিডিওতে চাইলে দেখে নিতে পারেন:
এরপর আর তেমন বিশেষ কোন ঘোরাঘুরি নেই। কিছুক্ষন সৈকতে সময় কাটিয়ে দিনের আলোটা নিভে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হলো। এই সুযোগে কেউ কেউ আবার সাগরে গা ভিজিয়ে নেয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করলোনা। এখানকার সীবিচ কক্সবাজারের মত উত্তাল না, অনেকটা নোনতা পানির নদীর মতই এর আচরন। আশপাশে অনেকগুলো দ্বীপ নিয়ে লাংকাবি দ্বীপপূঞ্জ, এজন্যে মূল দ্বীপটা পর্যন্ত ঢেউ এসে পৌছাতে পারেনা, ছোট দ্বীপগুলোতে ধাক্কা খেয়ে ঢেউগুলো মরে যায়।
লাংকাবি'র সমুদ্র সৈকত
হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হলাম, তারপর কিছুক্ষন জিরিয়ে নিলাম, কম্পিউটারে টুকটাক কাজকর্মও সেরে নিলাম। রাতে সী-ফুড দিয়ে ডিনার হবে, ভালো একটা টার্কি রেস্টুরেন্ট দেখেছিলাম, সেখানেই হয়তো যাওয়া হবে।
লাংকাবি'র পর্যটন পাড়া "পান্তাই চেনাং" এর রাস্তাঘাট
প্রথমেই বেরিয়ে একটা ট্রাভেল কোম্পানির সাথে পরের দিনে "আইল্যান্ড হপিং" অ্যাডভেঞ্চারের জন্যে প্যাকেজ কেনা হলো। প্রত্যেকের জন্যে দশ রিংগিত করে খরচ পড়লো, ওরা সকালে এসে গাড়িতে করে নিয়ে যাবে, দুতিন ঘন্টায় আশপাশের অনেকগুলো দ্বীপে ঘুরিয়ে নিয়ে আবার হোটেলে পৌছে দেবে। চমতকার জিনিস কিন্তু খুবই সস্তায় পাওয়া গেলো।
রাস্তার পাশে সীফুড রেস্টুরেন্টের বাইরে সাজিয়ে রাখা জীবন্ত লবস্টার
ডিনারের জন্যে হাটতে শুরু করলাম। রাস্তার পাশে অনেক ধরনের রেস্টুরেন্ট আর ক্যাফে রয়েছে। সারাদিন পুরো এলাকা প্রায় নিস্তব্ধ থাকলেও রাতে কেন জানি সবকিছু জেগে উঠেছে। আমাদের লক্ষ্য সীফুড রেস্টুরেন্ট, অনেকগুলো আছে এখানে এবং সব রেস্টুরেন্টের বাইরেই তাদের সার্ভিং মাছের একটা করে শোকেস রাখা আছে।
সী-ফিস শোকেস
লবস্টারের একটা খাবার আইটেম
এইটা কি মাছ মনে নাই
একটা চমতকার রেস্টুরেন্টে চমতকার সব খাওয়া দাওয়া শেষ করে আবার কিছুক্ষন ঘোরাঘুরি, তারপর হোটেলে গিয়ে ঘুম।